স্ক্র্যাপ ঘোষণায় আমদানি হচ্ছে প্রস্তুতকৃত লৌহপণ্য

চালান আটকে এনবিআরের হস্তক্ষেপ চেয়ে চিঠি কাস্টমসের

রড তৈরির প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ‘ফেরাস ওয়েস্ট অ্যান্ড স্ক্র্যাপ’ ঘোষণায় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে নিয়মিত পুরনো লোহার টুকরা আমদানি হয়।

তবে একই এইচএস কোডে (পণ্যের পরিচিতি) আনা বেশকিছু চালানে স্ক্র্যাপের পরিবর্তে ব্যবহারযোগ্য আয়রন ইনগট, এইচ-সেকশন, আই-বিম, আয়রন বার, স্টিল পাইলিং, আয়রন রড ও নন-অ্যালয় আয়রন ফ্ল্যাট শিটসহ বিভিন্ন প্রস্তুতকৃত ও পুরনো লৌহজাত পণ্য পাওয়ার পর জটিলতায় পড়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে খালাসের অপেক্ষায় থাকা এ ধরনের বেশ কয়েকটি চালান চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে দিয়েছে সংস্থাটি।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এসব পণ্য গলিয়ে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের পরিবর্তে সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি হতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ শুল্কের প্রস্তুতকৃত লৌহপণ্য স্ক্র্যাপ ঘোষণায় আনায় বড় ধরনের রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগও সামনে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে এ ধরনের চালানের শুল্কায়ন, গলন তদারকি ও খালাস কীভাবে হবে সে বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে জরুরি ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ নীতিগত নির্দেশনা চেয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ।

এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি সম্প্রতি এনবিআরের চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান রড তৈরির প্রধান কাঁচামাল ‘ফেরাস ওয়েস্ট অ্যান্ড স্ক্র্যাপ’ ঘোষণায় নিয়মিতভাবে পণ্য আমদানি করছে। তবে স্ক্যানিংয়ের সময় অনেক চালান সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর কায়িক পরীক্ষায় স্ক্র্যাপের পরিবর্তে ঘোষণাবহির্ভূত বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুত ও আমদানি নিষিদ্ধ প্রস্তুতকৃত পুরনো লৌহজাত পণ্যও পাওয়া যাচ্ছে। এসব ঘোষণাবহির্ভূত পণ্যের মধ্যে রয়েছে আয়রন ইনগট, এইচ-সেকশন, আই-বিম, নন-অ্যালয় আয়রন ফ্ল্যাট শিট, আয়রন বার, স্টিল পাইলিং ও আয়রন রড। বেশকিছু চালানে আনা পণ্য পুরনো হওয়ায় তা পুনর্ব্যবহারযোগ্য কিনা তা নিয়ে মতপার্থক্যও তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় অতীতে কয়েকটি ক্ষেত্রে আমদানিকারকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম কাস্টমস, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আমদানিকারকের কারখানায় ‘মেল্টিং সুপারভিশন’ বা গলন তদারকির শর্তে পণ্য খালাস দেয়া হয়েছিল।

চট্টগ্রাম কাস্টমস তাদের চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, আমদানিকারকের কারখানায় গিয়ে গলন তদারকি করা প্রকৃতপক্ষে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। বরং এ ধরনের তদারকি করতে গিয়ে কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ধরনের জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। বিশেষত বিপুলসংখ্যক কনটেইনারে স্ক্র্যাপ আমদানি হলে সংশ্লিষ্ট পণ্য গলাতে দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু ওই পুরো সময় কাস্টমস, কাস্টমস গোয়েন্দা ও ভ্যাট কর্মকর্তাদের সেখানে অবস্থান করা বাস্তবসম্মত নয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই মেল্টিং সুপারভিশন সঠিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না এবং রাজস্ব ফাঁকির আশঙ্কা থেকেই যায়।

কাস্টমসের তথ্যমতে, ২০২২ সালে এনবিআরের এক বিশেষ নির্দেশনায় একটি চালান নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বন্দরের অভ্যন্তরে স্ক্র্যাপে রূপান্তর অথবা ফার্নেসে গলিয়ে নিষ্পত্তির নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। তবে এতে বলা হয়েছিল, সিদ্ধান্তটি বিশেষ পরিস্থিতি ও বিশেষ বিবেচনায় দেয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পণ্যচালান শুল্কায়নের ক্ষেত্রে এটিকে নজির হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

চিঠিতে আরো বলা হয়, আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২৪-এর নিষিদ্ধ তালিকার ‘খ’ অংশের অনুচ্ছেদ ৪ অনুযায়ী পুনর্ব্যবহারযোগ্য কিছু পুরনো লৌহজাত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ। সেক্ষেত্রে আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের অনুমোদন ছাড়া এসব পণ্য খালাসযোগ্য নয়। কিন্তু স্ক্র্যাপ ঘোষণায় এ ধরনের পণ্য আসায় খালাস প্রক্রিয়ায় নতুন করে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

এনবিআর (কাস্টমস নীতি) ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে লৌহজাত পণ্য উৎপাদন ও নির্মাণ খাতের সম্প্রসারণের কারণে স্ক্র্যাপ আমদানির পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আনার প্রবণতাও। বিশেষ করে আমদানি নিষিদ্ধ কিংবা উচ্চ শুল্কের পণ্য স্ক্র্যাপ ঘোষণায় এনে শূন্য শুল্কের কাঁচামাল হিসেবে ছাড় নেয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় বিষয়টি এখন বড় ধরনের রাজস্ব ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। আবার অনেক সময় স্ক্র্যাপ ঘোষণায় এমন পণ্য পাওয়া যায়, যেগুলো প্রস্তুতকৃত রড, যা সরাসরি ব্যবহারযোগ্য।’

চট্টগ্রাম কাস্টমস চিঠিতে উল্লেখ করেছে, বর্তমানে বন্দরে আটকে থাকা চালানগুলোর নিষ্পত্তিতে তাৎক্ষণিক দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। এছাড়া ভবিষ্যতেও এ ধরনের আমদানির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। তাই বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং বিভিন্ন কাস্টমস দপ্তরের মতামতের ভিত্তিতে একটি সমন্বিত ও টেকসই নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গির আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে বৈধভাবে কাঁচামাল আমদানির মাধ্যমে উৎপাদন করে উচ্চ শুল্ক, বিদ্যুৎ ও অর্থায়ন ব্যয় বহন করতে হয়। তাই আমদানি পর‌ সঠিক তদারকি যেমন জরুরি, তেমনি পণ্যের পরিচিতি নির্ধারণে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

আরও